মুন্সিগঞ্জের বাঁশ-বেতের পণ্য যাচ্ছে বিদেশে

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার মধুপুর মনিপাড়া গ্রামের বাঁশ ও বেতের তৈরি সামগ্রী এখন বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। ওই গ্রামের ৮০ টি পরিবার এ কাজে জড়িয়ে আছেন। শত বছর ধরে বংশ পরম্পরায় এ পেশা আঁকড়ে ধরে আছে পরিবারগুলো। সেখানে অন্তত সাড়ে ৪০০ নারী-পুরুষ শ্রমিক রয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা যায় ওই গ্রামের ঘরে ঘরে বাঁশ ও বেত দিয়ে নানা শো পিচ তৈরিতে ব্যস্ততার চিত্র দেখা গেছে। বেতের ঝুড়ি, বাস্কেট, পেপার বাস্কেট, ফলের ঝুঁড়ি, আয়নার গ্লাস ফ্রেম, বেতের লেমজার বাতি, বেতের মোড়া, ফুলের টপসহ বাঁশ ও বেতের সামগ্রী তৈরি করে থাকে।

এখানকার সামগ্রী রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড ও ইস্কাটনের বাঁশ-বেতের সামগ্রীর দোকানগুলোতে বিক্রি করে থাকেন। সেখান থেকে দোকানিরা বিদেশেও রফতানি করে থাকেন। এখানকার বাঁশ ও বেতের পণ্য যাচ্ছে জাপান, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে। প্রতি মাসে এ গ্রাম থেকে বাঁশ ও বেতের তৈরি বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হয়ে থাকে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা।

মেসার্স মধুপুর কুটির শিল্পের মালিক সুভাষ দাস বলেন, বেত বাশের বিভিন্ন প্রকার জিনিস সম্পূর্ণ হাত দিয়ে তৈরি করে থাকি। কোনো ধরনের মেশিন দিয়ে তৈরি হয় না। এখানে বেঁতের ঝারবাতি, লেমসেট, ট্রে, সোফাসেট, ফুলদানী, মিরর, আয়নাসহ প্রায় ১০০ ডিজাইনের জিনিস তৈরি করে থাকি।

বাঁশ বেতের তৈরি জিনিসপত্র দেশের বিভিন্ন নামিদামি ব্যান্ড আমাদের কাছ থেকে নিয়ে দেশের বাইরে রফতানি করছে। তারা আমাদের কাছ থেকে কম মূল্যে জিনিস ক্রয় করে উচ্চ মূল্যে বিক্রয় করছে। সরাসরি রফতানি করতে পারলে আমরা লাভবান হতাম।

বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে আমরা খুবই দুর্বল। করোনায় মালামাল আটকে গেছে। কারখানায় নারী-পুরুষ মিলে ৬০ জনের বেশি কাজ করে। তাদের এক একজনের মাসিক বেতন সর্বনিম্ন ১২ হাজার টাকা। তাদেরও ঠিকমতো বেতন দিতে পারছি না। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন এক্সপোট ব্যবসায়ীরা আমাদের অগ্রিম মালের অর্ডার দিয়ে থাকে। তারা বিভিন্ন দেশে এসব মালামাল পাঠিয়ে থাকে। অনেক অর্ডার আসে দিতে পারি না। সরকার আমাদের ঋণের ব্যবস্থা করে দিলে এ ব্যবসায় অনেকের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যেতো।

কারখানার মালিক পন্ডিত দাস বলেন, বেত সংকট। আর্থিক অবস্থাও তেমন না। সরকার সাহায্য সহযোগিতা করলে কিছুটা হলেও ভালোভাবে থাকতে পারতাম। আমাদের তৈরি পণ্য কনোসফো, কুর্দিজুডক্স, আর্সেনিহ্যান্ডিগ্রাফস, বিডিগ্রেশন, অনির্বান, সানটেজ, জাগরনীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দেশ ও দেশের বাহিরে পাঠিয়ে থাকে। কিন্তু আমারা যে পরিশ্রম করি সে অনুযায়ী পয়সা পাই না। আসলটা ওইসব প্রতিষ্ঠান পেয়ে থাকে।

কুটির শিল্পি নির্মল দাস বলেন, কারখানায় ২০ জন লোক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। প্রতি মাসে আড়াই লাখ টাকা শুধু বেতনই দিতে হয়। করোনার কারণে খুব সমস্যায় আছি। অনেক জিনিস স্টক হয়ে গেছে। বিক্রী হচ্ছে না। বিক্রী না হলেও কর্মচারীর বেতন ঠিকই দিতে হচ্ছে। এতে খুব সমস্যায় আছি।

যতিন কুমার দাস বলেন, ৩৫ বছর ধরে এ কাজের সঙ্গে জড়িত। কারখানায় ৩০ জন নারী-পুরুষ কাজ করে। প্রতি মাসে আমার ৩ লাখ টাকা মাসিক বেতন দিতে হয় কর্মচারীদের। তাছাড়া পরিবারের সব সদস্য এ কাজের সঙ্গে জড়িত। আমাদের এসব মালামাল বিভিন্ন দেশে যায়। এছাড়া দেশেও প্রায় বিভিন্ন ব্র্যান্ড আমাদের কাছ থেকে মালামাল ক্রয় করে থাকে। কিছু ব্যবসায়ী রয়েছে আমাদের অর্ডার দিয়ে মালামাল নিয়ে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে অধিক মুনাফা পেয়ে থাকে। তাদের তুলনায় আমরা যদি একটুও পেতাম তাহলে ভালোভাবে এ শিল্পটা ধরে রাখা যেতো।

একজন নারী শ্রমিক পুস্প রানী দাস বলেন, ৫০ বছর ধরে এ কাজ করছি। এখন আমার ছেলে মেয়ে ও ছেলেবউ এ কাজ করে থাকে। পরিবারের কাজ শেষে বিভিন্ন ধরনের বেতের কাজ করি। আমাদের কাজ হচ্ছে বুনানো, চাপানো, পরিচ্ছন্নসহ আমরা হালকা কাজটাই করি। করোনার কারণে খুব সমস্যা হচ্ছে। মালামাল বিক্রি হলেই তো হাতে কাজ থাকে তা না হলে তো কাজ বন্ধ থাকে। কোনো মতে চলছে আর কি।

মুন্সিগঞ্জ জেলা বিসিক কার্যালয়ের উপ-ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, বিসিক ৪% সুদে ঋণ বিতরণ করছে। ব্যবসায়ীরা যদি গ্রুপ ভিত্তিক আবেদন করে তা হলে ভালো একটি ঋণ পাবে। কারখানার মালিকরা তৈরিকৃত পণ্য বিসিক শিল্প নগরীর অনলাইন পেইজে পোস্ট করলে ভালো লাভবান হতে পারবেন।

সিরাজদিখানের ইউএনও সৈয়দ ফয়েজুল বলেন, করোনায় হাতের কাজ গুলো থমকে গেছে। এতে তারা আর্থিক সংকটে পড়ে গেছেন। আমরা তাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে আসছি। বাংলাদেশ সরকার ব্যাংক, এনজিওসহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে ঋণ দিয়ে থাকে। কারুপণ্যের কাজগুলো ধরে রাখতে আমাদের মাধ্যমে তাদের সহযোগিতা করা হবে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*